পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির একমাত্র প্রধান হাতিয়ার হলো কৃষি। আর সেই কৃষির মূল চালিকাশক্তি হলেন গ্রামের অগণিত ক্ষেতমজুর ও কৃষিশ্রমিক, যাঁরা বছরের পর বছর অন্যের জমিতে কাজ করে ফসল ফলান। অথচ নিজেদের নামে কোনো জমি না থাকায় বহু সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত থেকে গেছেন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই রাজ্য সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছে—‘কৃষক বন্ধু (ভূমিহীন ক্ষেতমজুর) প্রকল্প ২০২৬’। রাজ্য সরকার এবার প্রত্যেকের জন্যই এনেছেন কিছু না কিছু নতুন প্রকল্প যার মাধ্যমে উপকৃত হবেন অনেকেই।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের জন্য আলাদা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজ্যের গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ব্লক ও গ্রামাঞ্চলে প্রকল্পটি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
কৃষক বন্ধু প্রকল্পের নতুন শাখা: কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?
রাজ্যে আগে থেকেই Krishak Bandhu Scheme চালু ছিল। তবে সেই প্রকল্পের সুবিধা মূলত পেতেন যাঁদের নিজের নামে কৃষিজমি রয়েছে বা নথিভুক্ত বর্গাদার। ফলে বিপুল সংখ্যক ক্ষেতমজুর, যারা দিনমজুরি ভিত্তিতে কৃষিকাজ করেন, তাঁরা এর বাইরে থেকে যেতেন।
নতুন ‘ভূমিহীন ক্ষেতমজুর’ শাখাটি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই চালু হয়েছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, যাঁদের কোনো নিজস্ব চাষযোগ্য জমি নেই এবং যাঁদের প্রধান আয়ের উৎস কৃষিশ্রম—তাঁদের জন্যই এই প্রকল্প। অর্থাৎ, প্রকৃত প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষদের সরাসরি আর্থিক সুরক্ষা দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
বার্ষিক ৪,০০০ টাকার সরাসরি আর্থিক সহায়তা
এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য উপভোক্তাদের বছরে মোট ৪,০০০ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। কৃষিকাজের মৌসুমকে মাথায় রেখে এই অর্থ দুই কিস্তিতে প্রদান করা হবে—খরিফ মরসুমের আগে ২,০০০ টাকা এবং রবি মরসুমের আগে আরও ২,০০০ টাকা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই টাকা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) পদ্ধতিতে পাঠানো হবে। ফলে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সুযোগ থাকবে না। গ্রামীণ এলাকায় স্বচ্ছ ও দ্রুত আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা নেবে বলেই প্রশাসনের আশা।
কারা আবেদন করতে পারবেন? বিস্তারিত যোগ্যতার শর্ত
এই প্রকল্পে আবেদন করার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হবে। প্রথমত, আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর নামে কোনো চাষযোগ্য কৃষিজমি থাকা চলবে না। তৃতীয়ত, আবেদনকারীর প্রধান পেশা হতে হবে কৃষিশ্রম বা অন্যের জমিতে কাজ করা।
যাঁরা ইতিমধ্যেই মূল কৃষক বন্ধু প্রকল্পের আওতায় জমির ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, তাঁরা এই নতুন শাখায় আবেদন করতে পারবেন না। একইভাবে, সরকারি খাতায় বর্গাদার হিসেবে নথিভুক্ত থাকলেও এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে না।
সরকারি মহল জানিয়েছে, প্রকৃত ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের চিহ্নিত করতেই ব্লক প্রশাসন ও কৃষি দপ্তর যৌথভাবে যাচাই প্রক্রিয়া চালাবে।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
প্রকল্পে আবেদন করতে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দিতে হবে। আধার কার্ড এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে এবং সেটির সাথে আধার নম্বর সংযুক্ত থাকতে হবে। পাসবুকের প্রথম পাতার কপি বা বাতিল চেক জমা দিতে হতে পারে।
এর পাশাপাশি একটি সচল মোবাইল নম্বর দিতে হবে, যাতে টাকা জমা হওয়ার বার্তা পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং স্ব-ঘোষণাপত্রও আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার কার্ড পরিচয়পত্র হিসেবে চাওয়া হতে পারে।
প্রশাসন বারবার সতর্ক করছে—নামের বানান যেন আধার ও ব্যাঙ্কের নথিতে এক থাকে। ছোট ভুলের কারণে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে।
কোথায় ও কীভাবে আবেদন করবেন?
বর্তমানে আবেদন প্রক্রিয়া মূলত অফলাইন পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। ব্লক সহ-কৃষি অধিকর্তার (ADA) দপ্তর অথবা সরকারি সহায়তা শিবির থেকে নির্দিষ্ট ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করে নির্দিষ্ট ক্যাম্প বা দপ্তরে জমা দিতে হবে।
ফর্ম জমা দেওয়ার পর একটি স্বীকৃতি স্লিপ বা অ্যাকনলেজমেন্ট আইডি দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে আবেদন স্ট্যাটাস জানার জন্য এই স্লিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন জানিয়েছে, আবেদন যাচাইয়ের পর উপযুক্ত প্রার্থীদের নাম নথিভুক্ত করে ধাপে ধাপে অর্থ প্রদান শুরু হবে।
পুরনো ও নতুন কৃষক বন্ধু প্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য
পুরনো কৃষক বন্ধু প্রকল্পে জমির পরিমাণ অনুযায়ী বছরে ৪,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হতো। সেখানে জমির মালিকানা ছিল মূল শর্ত। কিন্তু নতুন ভূমিহীন ক্ষেতমজুর শাখায় জমি না থাকাই প্রধান যোগ্যতা।
এই পার্থক্যের ফলে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক ক্ষেতমজুর প্রথমবারের মতো সরকারি আর্থিক সহায়তার আওতায় আসতে চলেছেন। প্রশাসনের অনুমান, কয়েক লক্ষ কৃষিশ্রমিক এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে ৪,০০০ টাকা বড় অঙ্ক না হলেও কৃষিশ্রমিক পরিবারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। কৃষিকাজের মরসুমে বীজ, সার বা দৈনন্দিন খরচ মেটাতে এই অর্থ কাজে আসবে। পাশাপাশি গ্রামীণ বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। কৃষি নির্ভর রাজ্যে ভূমিহীন শ্রমজীবী মানুষের জন্য পৃথক আর্থিক কাঠামো তৈরি করা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
আবেদনের সময় যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
অনেক সময় দেখা যায়, ভুল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, আধারের সাথে ব্যাঙ্ক লিঙ্ক না থাকা, বা ভুল মোবাইল নম্বরের কারণে টাকা জমা হতে সমস্যা হয়। তাই ফর্ম পূরণের সময় সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো কাটাকাটি বা ওভাররাইটিং না করাই শ্রেয়।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ভুয়ো তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হওয়ার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
প্রান্তিক কৃষিশ্রমিকদের জন্য নতুন ভরসা
‘কৃষক বন্ধু (ভূমিহীন ক্ষেতমজুর) প্রকল্প ২০২৬’ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের জন্য এটি এক নতুন ভরসা। নিয়ম মেনে আবেদন করলে এবং সঠিক তথ্য দিলে সহজেই এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি যোগ্য হন, তাহলে নিকটবর্তী ব্লক কৃষি দপ্তরে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য জেনে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। সময়মতো আবেদনই নিশ্চিত করতে পারে সরকারি আর্থিক সহায়তা।
